তাহারেই পড়ে মনে- সুফিয়া কামাল

তাহারেই পড়ে মনে- সুফিয়া কামাল

কবি পরিচিতি :

  • নাম: সুফিয়া কামাল।
  • সুফিয়া কামালের রচনা: তাহারেই পড়ে মনে- সুফিয়া কামাল
  • জন্ম তারিখ  :  ২০ জুন, ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ
  • জন্মস্থান  :  শায়েস্তাবাদ, বরিশাল।
  • পিতার নাম  :  সৈয়দ আবদুল বারী।
  • মাতার নাম :  নওয়াবজাদী  সৈয়দা সাবেরা খাতুন।
  • শিক্ষাজীবন:  অনানুষ্ঠানিক ও স্বশিক্ষায় শিক্ষিত।
  •  পেশা/কর্মজীবন কলকাতার একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা। পরবর্তীতে সাহিত্য সাধনা ও নারী আন্দোলনে ব্রতী হন।
  • সাহিত্যকর্ম  কাহিনী কাব্য :  সাঁঝের মায়া, মায়া কাজল, উদাত্ত পৃথিবী, মন ও জীবন, প্রশস্তি ও প্রার্থনা।
  • গল্প  : কেয়ার কাঁটা।
  • ভ্রমণকাহিনী : সোভিয়েতের দিনগুলি।
  • স্মৃতিকথা : একাত্তরের ডায়েরী।
  • শিশুতোষ গ্রন্থ  : ইতল বিতল, নওল কিশোরের দরবারে।
  • পুরস্কার ও সম্মাননা= বুলবুল ললিতকলা একাডেমি পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, নাসিরউদ্দীন স্বর্ণপদক, মুক্তধারা সাহিত্য পুরস্কার।
  • জীবনাবসান  মৃত্যু তারিখ : ২০ নভেম্বর, ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দ।

কবি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:

  1. সুফিয়া কামালের প্রথম বিয়ে হয়-মামাত ভাই সৈয়দ নেহাল হোসেনের সঙ্গে ১৯২৩ সালে।
  2. তখন তিনি পরিচিত হন-সুফিয়া এস. হোসেন নামে।
  3. তাঁকে বলা হয় জননী সাহসিকা।
  4. সুফিয়ার স্বামী সৈয়দ নেহাল মৃত্যুবরণ করেন-১৯৩২ সালে যক্ষা রোগে।
  5. তাঁর দ্বিতীয়বার বিবাহ হয়-১৯৩৯ সালে চট্টগ্রাম নিবাসী লেখক কামাল উদ্দীন আহমেদের সঙ্গে। এরপর তিন„সুফিয়া কামাল নাম গ্রহণ করেন।
  6. সুফিয়া কামাল সম্পাদক ছিলেন-বেগম পত্রিকা (১৯৪৭)।
  7. তিনি মহিলা সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও নেতৃত্ব দেন-মহিলা সংগ্রাম পরিষদ (১৯৬৯)। আজ এর নাম বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ।
  8. তিনি যে ধরনের কবি-রবীন্দ্র কাব্যধারার গীতিকবিতা রচিয়তা।
  9. তিনি পুরস্কার লাভ করেন- বাংলা একাডেমি পুরস্কার(১৯৬২),লেনিন পুরস্কার, রাশিয়া (১৯৭০), একুশে পদক (১৯৭৬), বেগম রোকেয়া পদক (১৯৯৬),স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৯৭) ইত্যাদি।

তাহারেই পড়ে মনে কবিতার উৎসঃ

তাহারেই পড়ে মনে কবিতাটি ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দ মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। পরে কবিতাটি বেগম সুফিয়া কামালের প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ সাঁঝের মায়াতে অন্তর্ভুক্ত হয়।

মর্মবাণী/মূলবাণী/উপজীব্য বিষয়: বিষাদময় রিক্ততার সুর।

অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় :

  • বাংলার শ্যামল প্রকৃতিতে বসন্ত ঋতুর আগমন সম্পর্কে জানতে পারবে।
  • বসন্তের আগমনে কবি ও কবিভক্তের অনুভূতি সম্পর্কে জানতে পারবে।
  • বসন্ত ঋতু সম্পর্কে কবির উদাসীনতার কারণ অনুধাবন করতে পারবে।
  • রিক্ত-শূন্য কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের প্রতি কবির অনুরাগের কারণ অনুধাবন করতে পারবে।
  • এই কবিতাটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য নাটকীয়তা ও সংলাপনির্ভরতা সম্পর্কে ধারণা লাভ করবে।
  • তাহারেই পড়ে মনে- সুফিয়া কামাল

শব্দার্থ ও টীকা:

  1. উত্তরীয়  →  চাদর
  2. পাথার   →  সমুদ্র
  3. লবে   →    নেবে
  4. কুহেলি  →   কুয়াশা
  5. সমীর   →   বাতাস
  6. উš§না   →  অন্যমনস্ক, অনুৎসুক
  7. বরিয়া   →  বরণ করে
  8. মাধবী  →   বাসন্তীলতা বা তার ফুল
  9. অর্ঘ্য   →     অঞ্জলি/ উপহার
  10. অলখ   →    দৃষ্টির অগোচরে
  11. বন্দনায়  →  স্তুতিতে, প্রশংসায়।
  12. মধু-স্বরে  →  মিষ্টি সুরে, কোমল কণ্ঠে।
  13. ফাগুন স্মরিয়া  →  ফাল্গুন মাসকে অর্থাৎ বসন্তকালকে স্মরণ করে।
  14. তাহারেই পড়ে মনে বসন্তের আগমনে কবির অন্তরে বিদায়ী শীতের কথা জেগে ওঠে।
  15. অলখের পাথার বাহিয়া  → কোন অদৃশ্যলোকের সাগর পার হয়ে।
  16. আগমনী গানে  → মহৎ কিছুর আগমন উপলক্ষে মঙ্গলসূচক গান।

কবিতার ছন্দ বিশ্লেষণ:

↓  ↓↓ ↓↓↓ ↓↓   ↓↓↓ ↓  ↓↓↓ ↓↓↓

হে কবি, নীরব কেন / ফাগুন যে এসেছে ধরায়, (৮+ ১০)

↓↓↓ ↓↓↓↓↓    ↓↓ ↓ ↓ ↓↓ ↓↓↓↓

বসন্তে বরিয়া তুমি / লবে না কি তব বন্দনায়?  (৮ + ১০)

↓↓↓  ↓ ↓↓ ↓↓  ↓↓

কহিল সে স্নিগ্ধ আঁখি তুলি (১০)

↓↓↓ ↓↓↓ ↓↓ ↓↓

দক্ষিণ দুয়ার গেছে খুলি? (১০)

বিশ্লেষণ : ‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতাটি অক্ষরবৃত্ত ছন্দে রচিত একটি সংলাপনির্ভর কবিতা। উপরের চার লাইনের ছন্দ বিশ্লেষণে দেখা যায়, কবিতাটির মূলপর্ব ৮ ও ১০ মাত্রার। কবিতাটির দুই পর্ব ও এক পর্বের পংক্তি রয়েছে। দুই পর্বের পংক্তিতে মাত্রাসংখ্যা (৮ +১০) = ১৮ এবং এক পর্বের পংক্তির মাত্রা সংখ্যা ১০। তাহারেই পড়ে মনে- সুফিয়া কামাল

কোনো কোনো পংক্তিতে ৪ মাত্রার অতিপর্ব রয়েছে। যেমন :

↓↓↓↓    ↓↓↓↓   ↓↓↓↓    ↓↓ ↓↓ ↓↓ ↓↓ ↓↓

কহিলাম,/  উপক্ষোয়  ঋতুরাজে / কেন কবি দাও তুমি ব্যথা

   (৪            + ৮          + ১০)

↓↓  ↓↓   ↓↓↓↓  ↓↓ ↓↓      ↓↓↓   ↓↓↓   ↓↓ ↓

রিক্ত হস্তে!/ তাহারেই পড়ে মনে, /   ভুলিতে   পারি না  কোন মতো

  (৪            + ৮             + ১০)

ছন্দ : কবিতাটি অক্ষরবৃত্ত ছন্দ রচিত। ৮ ও ১০ মাত্রার পর্ব। স্তবক বিন্যাসে কিছুটা বৈচিত্র আছে।

পর্ব : প্রথম পর্ব আট মাত্রার, দ্বিতীয় পর্ব দশ মাত্রায়। প্রতি চরণে পর্ব দুইটি।

প্রতিচরণ মাত্রা : আঠারোটি।

সারমর্ম:

এ কবিতায় প্রকৃতি ও মানবমনের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাৎপর্যময় অভিব্যক্তি পেয়েছে। সাধারণভাবে প্রকৃতির সৌন্দর্য মানব মনের অফুরন্ত আনন্দের উৎস। এ কবিতায় কবির ব্যক্তিজীবনের দুঃখময় ঘটনার ছায়াপাত ঘটেছে। তাঁর সাহিত্য সাধনার প্রধান সহায়ক ও উৎসাহদাতা স্বামী সৈয়দ নেহাল হোসেনের মৃত্যুতে (১৯৩২) কবির জীবনে শূন্যতা নেমে আসে। তাহারেই পড়ে মনে কবিতাকে আচ্ছন্ন করে আছে এই বিষাদময় রিক্ততার সুর। বসন্ত এলেও উদাসীন কবির অন্তর জুড়ে রিক্ত শীতের করুণ বিদায়ের বেদনা।

পাঠ বিশ্লেষণ:

  • হে কবি, নীরব কেন ফাগুন যে এসেছে ধরায়,
  • বসন্তে বরিয়া তুমি লবে না কি তব বন্দনায়?
  • কহিল সে স্নিগ্ধ আঁখি তুলি
  • “দক্ষিণ দুয়ার গেছে খুলি?

কবি প্রকৃতির রূপের সাথে নিজেকে প্রকাশ করবেন। সেটিই স্বাভাবিক। অথচ কবি উদাসীন। কাব্য ও গান রচনায় তিনি নিস্ক্রিয়। কবি ভক্তরা তাঁর কাছে জানতে চাইছে কেন তিনি নীরব। ফাগুন চলে এসেছে, বসন্তের ফুল ফুলে প্রকৃতি রঙে-রূপে ভরে উঠেছে- কবি কেন তার বন্দনা করছেন না, তাকে কি কবি বরণ করে নেবেন না? দখিনা বাতাস বইছে। কী স্নিগ্ধ পরিবেশ, তা কি কবির আগ্রহ জাগাতে পারছে না?

  • বাতাবি নেবুর ফুল ফুটেছে কি? ফুটেছে কি আমের মুকুল?
  • দখিনা সমীর তাঁর গন্ধে গন্ধে হয়েছে কি অধীর আকুল?”
  • “এখনো দেখনি তুমি?” কহিলাম, “কেন কবি আজ
  • এমন উন্মনা তুমি? কোথা তব নব পুস্পসাজ?”

বসন্তের আগমনে বাতাবি লেবুর ফুল, আমের মুকুলের কিন্তু উন্মনা কবি এসব কিছুই কি লক্ষ করছেন না? কবি তা সত্তে¡ও যা বলছেন তা তো তাঁর উদাসীনতাকেই স্পষ্ট করে তুলেছে। বসন্ত এসেছে, অথচ কবি বসন্তের ফুলে শয্যা সাজানোর আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। কবির নিজের সাজও প্রকৃতির সাথে মেলে না। ভক্তরা ভেবে আকুল।

  • কহিল সে সুদূরে চাহিয়া
  • “অলখের পাথার বাহিয়া
  • তরী তার এসেছে কি? বেজেছে কি আগমনী গান?
  • ডেকেছে কি সে আমারে? শুনি নাই, রাখি কি সন্ধান।”

কবি সুদূরে দৃষ্টি ফেলে নিরাশ কণ্ঠে জানতে চান, অলখের পাথার বেয়ে তার আনন্দের তরি এসেছে কিনা, তার আগমনী সংগীত ধ্বনিত হয়েছে কিনা? তারা কি কবিকে ডেকেছে? কই? কবি তো কিছুই শোনেননি, কোন কিছুর সন্ধানই তো তার কাছে নেই। কবির এহেন নির্লিপ্ততা ভক্তকে আহত করল।

  • কহিলাম, “ ওগো কবি! রচিত লহ না আজও গীতি,
  •  বসন্ত -বন্দনা তব কন্ঠে শুনি- এ মোর মিনতি। ”

কবি ভক্তকুল তবুও অনুরোধ করল, ওসব না হোক, বসন্ত তোমার দুয়ারে এসেছে। প্রকৃতি সেজেছে তার আপন সাজে, আপন স্বভাবে। তাকে আনন্দচিত্তে বরণ করে লও। তোমার কণ্ঠে বসন্ত বন্দনা শুনতে আমরা অপেক্ষায় রয়েছি। আমাদের সেই সংগীত শুনিয়ে আনন্দ দাও, মুগ্ধ কর। তাহারেই পড়ে মনে- সুফিয়া কামাল

  • কহিল সে মৃদু মধু স্বরে
  • “নাই হলো, না হোক এবারে
  • আমারে গাহিতে গান, বসন্তেরে আনিতে বরিয়া
  • রহেনি, সে ভুলেনি তো, এসেছে তা ফাগুনে স্মরিয়া।”

কবি সব ভক্তের কথা শুনে, নিচুস্বরে স্নিগ্ধ ভাষায় উত্তর দিলেন, তা না হোক। আমাকে আনন্দ সংগীত শোনাতে, কিংবা গান গাইতে অনুপ্রাণিত করতেও তো বসন্ত আসেনি। সে এসেছে ফাগুনকে স্মরণ করে। তাকে বরণ করে নিতে আমাকেই লাগবে, তা কেন?

  • কহিলাম :  “ওগো কবি, অভিমান করেছ কি তাই?
  • যদিও এসেছে তবু তুমি তারে করিলে বৃথাই।”

ভক্তরা কবিকে বলল- এ কারণেই কি তুমি অভিমান করেছ? প্রকৃতির নিয়ম মেনে যদিও সে এসেছে, তবু কি তাতে তোমার অধিকার নেই? তুমি কি তাকে বরণ করে আমাদের আনন্দের সাথে সম্পৃক্ত করার তাগিদ অনুভব কর না? তুমি তাকে বৃথাই ফেরত পাঠাবে? তা থেকে দূরে সরে থেকে আমাদেরও দূরে রাখবে?

  • কহিল সে পরম হেলায়
  • “বৃথা কেন? ফাগুন বেলায়
  • ফুল কি ফোটেনি শাখে? প্স্পুারতি লভেনি কি ঋতুর রাজন?
  • মাধবী কুঁড়ির বুকে গন্ধ নাহি? করে নাই অর্থ্য বিরচন?”

কবি ভক্তদের শোনালেন তাঁর চির ব্যথার কথা গোপন করে, কেন ও কথা বলছ? বসন্ত বেলায় কি ফুল ফোটেনি? ফুলে ফুলে পৃথিবী সাজিয়ে বসন্ত কি ঋতুরাজ হয়ে ওঠেনি? মাধবীর গন্ধে কী তোমরা মেতে উঠছ না? তাহলে আমাকে এমন করে বলছ কেন?

  • “হোক, তবু বসন্তের প্রতি কেন এই তব তীব্র বিমুখতা?”
  • কহিলাম, “উপেক্ষায় ঋতুরাজে কেন কবি দাও তুমি ব্যথা?”

ভক্তরা যুক্তি দেখাল, তা যদি হয় হোক, কিন্তু তাই বলে তুমি কি আগ্রহ দেখাবে না? এমন কঠোর কঠিন হয়ে ফাগুন বিমুখ হয়ে থাকবে? হে প্রিয় কবি, তুমি বসন্ত বিমুখ হয়ে তোমার শত শত ভক্তকে কেন এত ব্যথা দিচ্ছ? কেন তুমি যথারীতি সানন্দে বসন্ত বন্দনা না করে তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে রয়েছ? সুফিয়া কামালের রচনা: তাহারেই পড়ে মনে।

  • কহিল সে কাছে সরে আসি
  • “কুহেলি উত্তরী তলে মাঘের সন্ন্যাসী
  • গিয়াছে চলিয়া ধীরে পুস্পশূন্য দিগন্তের পথে
  • রিক্ত হস্তে তাহারেই পড়ে মনে, ভুলিতে পারি না কোন মতে।”

কবি বসন্তের প্রসঙ্গ থেকে সরে এসে বসন্তের পূর্ব ঋতুর প্রসঙ্গ স্মরণ করিয়ে দিলেন ভক্তদের। বসন্ত আসার আগে সর্বত্যাগী সর্বরিক্ত সন্ন্যাসীর মতো মাঘের শীতের কথা বলতে লাগলেন। তাকে কবিহৃদয়ে রিক্ততায় যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, তাকে তিনি কিছুতেই ভুলতে পারছেন না। শীতের ফুলহীন, ফলহীন, পাতাহীন রিক্ত বৃক্ষের যন্ত্রণা কবির হৃদয়ে। তা তিনি কিছুতেই মুছে দিতে পারছেন না। প্রকৃতি বসন্তের আগমনে অপরূপ রূপে ফুলের সাজে সাজলেও তার মনজুড়ে শীতের রিক্ততার ছবি। কবি সেই ছবি কিছুতেই স্মৃতি থেকে মুছে ফেলতে পারছেন না। ভক্তদের অনুরোধে বসন্ত বন্দনা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ কবির হৃদয়ে যে শূন্যতা, তা প্রিয়জন হারানোর গভীর শোক ও বেদনাসৃষ্ট শূন্যতা।

  • ‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতার গুরুত্বপূর্ণ লাইন
  • তরী তার এসেছে কি? বেজেছে কি আগমনী গান?
  • বসন্ত -বন্দনা তব কণ্ঠে শুনি- এ মোর মিনতি।
  • কুহেলি উত্তরী তলে মাঘের সন্ন্যাসী-
  • গিয়াছে চলিয়া ধীরে পুষ্পশূন্য দিগন্তের পথে রিক্ত হস্তে!

“হে কবি, নীরব কেন-ফাগুন যে এসেছে ধরায়, বসন্তে বরিয়া তুমি লবে না কি তব বন্দনায়?”- উক্তিটি কবির প্রতি ভক্তবৃন্দের।

  • ওগো কবি, অভিমান করেছ কি তাই?
  • যদিও এসেছে তবু তুমি তারে করিলে বৃথাই।

‘তাহারেই পড়ে মনে, ভুলিতে পারি না কোন মতে’- উক্তিটি শীত প্রকৃতির উদ্দেশ্যে বেগম সুফিয়া কামালের।

গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (জ্ঞানমূলক):

  1. কবি মাঘের সন্ন্যাসী রূপে কল্পনা করেছেন- শীত ঋতুকে।
  2. কবিতায় শীতের রূপকে স্থাপন করা হয়েছে-বসন্তের বিপরীতে।
  3. বসন্তের আগমনে কবির হৃদয়ে জেগে ওঠে-শীতের কথা।
  4. দক্ষিণা সমীর অধীর আকুল – বাতাসি লেবু ও আমের মুকুলের গন্ধে।
  5. কবির নিরবতার কারণ – প্রিয় বিয়োগ।
  6. পুস্পশূন্য দিগন্তে পথে চলিয়া গিয়াছে – মাঘের সন্ন্যাসী।
  7. মাঘের সন্ন্যাসী মারা গেছে- রিক্ত হস্তে।
  8. ঋতুর রাজন – বসন্ত।
  9. কবিভক্তের প্রতি কবির প্রশ্ন জিজ্ঞাসা প্রমাণ করে – কবির উদাসীনতা।
  10. ‘দক্ষিণ দুয়ার গেছে খুলি’- উক্তিটি – কবির।
  11. ‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতার মূল বিষয় – জীবনের বিষণ মাধুর্য।
  12. গঠন রীতির দিক দিয়ে ‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতাটি – সংলাপ নির্ভর কবিতা।
  13. ‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয়- ১৯৩৫ সালের ‘মাসিক মোহাম্মদী’ পত্রিকায়।
  14. ‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত – ‘সাঁঝের মায়া’ কাব্যগ্রন্থের।
  15. স্তবক বিন্যাসে বৈচিত্র্য আছে – ‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতার।
  16. সুফিয়া কামালের রচনা: তাহারেই পড়ে মনে।

 অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর :

১। ‘এসেছে তা ফাগুনে স্মরিয়া’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

উত্তর : বসন্তের প্রতি অভিমান প্রকাশ করতে কবি আলোচ্য চরণটি উপস্থাপন করেছেন। ব্যক্তি জীবনের দু:খবোধ কবিকে আচ্ছন্ন  করে রেখেছে, তাই প্রকৃতির প্রতি তিনি বিমুখ। প্রকৃতিতে বসন্ত এসেছে. ফুলে ফুলে ভরে গেছে চারদিক, কিন্তু তা কবিমনে সাড়া জাগাতে পারেনি। কবি প্রতিবছর বসন্তকে বরণ করে নিতে বসন্তগীত রচনা করলেও এবার তা করেননি। কবি ভক্তের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, তিনি বসন্তকে বরণ না করে নিজের প্রকৃতিতে বসন্ত এসেছে। বসন্তের প্রতি কবির অভিমান এখানে মূর্ত হয়ে উঠেছে।

২। বসন্তের সৌন্দর্য কবির কাছে অর্থহীন কেন? – ব্যাখ্যা কর।

উত্তর : প্রিয়জন হারানোর ব্যথায় কবিমন শোকাচ্ছন্ন, বসন্তের সৌন্দর্য তাই কবির কাছে অর্থহীন। প্রকৃতির সৌন্দর্য মানবমনে অফুরন্ত আনন্দের উৎস। বসন্ত প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য কবির মনে শিহরণ জাগানে সেটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু কবি মন রিক্ততার হাহাকারে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। বসন্ত এলেও তাঁর মনে আনন্দ নেই। তাই বসন্তের সৌন্দর্য কবির কাছে অর্থহীন।

৩। কবি উদাসীনতা নিয়ে কবিভক্ত প্রশ্ন করেছেন কেন?

উত্তর : ঋতুরাজ বসন্তকে উপেক্ষা করে ব্যথা দেওয়ার কারণে কবিভক্ত কবির উদাসীনতা নিয়ে প্রশ্ন করেছেন। প্রকৃতিতে বসন্ত এলেও কবিভক্ত লক্ষ করেছেন তিনি প্রিয় কবি বসন্ত বন্দনা করে কবিতা লিখছেন না। ফলে ব্যথিত ও হতাশ কবি ভক্ত কবিকে বিভিন্ন প্রশ্নের মাধ্যমে এর কারণ উদঘাটন করার চেষ্টা করেছেন। ঋতুরাজকে উপেক্ষা করার কারণেই কৌতুহলী কবিভক্ত কবির উদাসীনতা নিয়ে প্রশ্ন করেছেন।

৪। ‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতায় কোন বিষয়টি প্রত্যাশা করা হয়েছে?- ব্যাখ্যা কর।

উত্তর : কবিতাটিতে কবির ঋতুরাজ বসন্তকে বরণ করে নেওয়ার প্রত্যাশা করা হয়েছে। ‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতায় কবির ব্যক্তি জীবনের দুঃখময়  ঘটনার কথা বলা হয়েছে। সাধারণভাবে প্রকৃতির সৌন্দর্য মানবমনের অফুরন্ত আনন্দের উৎস। বসন্ত প্রকৃতির অপরুপ সৌন্দর্য যে কবি মনে আনন্দ শিহরণ জাগাবে এবং তিনি তাকে ভাবে ছন্দে সুরে ফুটিয়ে তুলবেন সেটিই প্রত্যাশিত। কবিমন যদি কোন কারণে শোকাচ্ছন্ন কিংবা বেদনা ভারাতুর থাকে তবে বসন্ত তার সমস্ত সৌন্দর্য সত্তে¡ও কবির অন্তরকে স্পর্শ করতে পারে না।

৫। “হে কবি, নীরব কেন ফাগুন যে এসেছে ধরায়।” – ব্যাখ্যা কর।

উত্তর : প্রকৃতিকে বসন্তের আগমন হলেও কবি উদাসীন ও নীরব থাকায় ভক্তরা তাঁকে প্রশ্নোক্ত কথাটি বলেছে। বসন্তের আগমনে প্রকৃতি নতুন রূপে সাজে। কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের প্রকৃতিতে যেমন রিক্ততার রূপ থাকে, ফাগুনের শুরুতে বসন্তের আবির্ভাবে তা মুছে যায়। তখন গাছে গাছে নতুন পাতা গজায়, ফুলে ফুলে ভরে ওঠে বৃক্ষ শাখা, কোকিলের ডাক চারদিক মাতিয়ে রাখে। কবি মনে ফুপে ওঠে অন্যরকম আমেজ। উৎফুল্ল হয়ে কবি বসন্তকে বরণ করে নেন, রচনা করেন বসন্তের আগমী গান। কিন্তু এই বসন্তের আগমনেও যখন ‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতার কবি সুফিয়া কামালের মনে আনন্দবার্তা আসেনি, তখন কবি ভক্ত চিন্তিত হয়ে পড়ে এবং কবিকে বলে, হে কবি, নীরব কেন? ফাগুন যে এসেছে ধরায়।

৬। ‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতাকে আচ্ছন্ন করে আছে সেই বিষাদময় রিক্ততার সুর।-বুঝিয়ে লেখ।

উত্তর : ‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতায় প্রকৃতি ও মানবমনের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রতিফলিত হয়েছে। এখানে কবির ব্যক্তিজীবনের দু:খময় ঘটনার ছায়াপাত ঘটেছে। তাঁর সাহিত্যসাধনার প্রধান সহায়ক ও উৎসাহদাতা স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুতে তাঁর জীবনে নেমে আসে প্রচন্ড শূন্যতা এবং ব্যক্তিজীবন ও কাব্যসাধনার ক্ষেত্রে নেমে আসে এক দু:সহ বিষণতা। কবি মন রিক্ততার হাহাকারে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।

৭। ‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতায় কোন ঘটনার ছায়াপাত ঘটেছে? ব্যাখ্যা কর।

উত্তর : ‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতায় কবির ব্যক্তি জীবনের দু:খময় ঘটনার ছায়াপাত ঘটেছে। কবির সাহিত্য সাধনা সহায়ক ও উৎসাহদাতা স্বামী সৈয়দ নেহাল হোসেনের আকস্মিক মৃত্যুতে তাঁর জীবনে প্রচন্ড শূন্যতা নেমে আসে। তাঁর ব্যক্তিজীবন ও কাব্যসাধনায় নেমে আসে এক দুঃসহ বিষণতা। কবিমন আচ্ছন্ন হয়ে যায় রিক্ততার হাহাকারে। ‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতায় ফুটে উঠেছে এমনই বিষাদময় রিক্ততার সুর।

৮। ‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতায় শীত ঋতুকে কীসের সাথে তুলনা করা হয়েছে? ব্যাখ্যা কর।

উত্তর : ‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতায় শীত ঋতুকে মাঘের সন্ন্যাসীর সাথে তুলনা করা হয়েছে। শীত ঋতুতে চারদিকে নিঃস্বতা ও রিক্ততার যে ছাপ পাওয়া যায় তাতে প্রকৃতিকে সন্ন্যাসীর মতো অলংকারহীন মনে হয়। কবি সুফিয়া কামাল তাঁর ‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতায় শীতের রিক্ত ও জরাজীর্ণতাকে বোঝাতে শীত ঋতুকে মাঘের সন্ন্যাসী বলে উল্লেখ করেছেন। শীত ঋতুতে চারদিকে পাতাবিহীন গাছের যে প্রাকৃতিক নান্দনিকতা তৈরি হয় তা দৃশ্যত সন্ন্যাসীর মতোই মনে হয়।

৯। সুফিয়া কামাল ‘জননী’ সম্ভাষণে ভূষিত হয়েছেন কেন?

উত্তর : সুফিয়া কামাল সাহিত্যসাধনার পাশাপাশি নারী আন্দোলনে ব্রতী হয়েছিলেন বলেই জননী সম্ভাষণে ভূষিত হয়েছেন। নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে নিজেকে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন সুফিয়া কামাল। এর মধ্যেই আবার বাংলা ভাষা ও সাহিত্য রচনায় আত্মনিয়োগ করেছেন তিনি। পরবর্তীকালে সাহিত্যসাধনার পাশাপাশি তিনি নারী আন্দোলনেও ব্রতী হয়েছিলেন। এ কারণে তাঁকে জননী সম্ভাষণে ভূষিত করা হয়েছে।

১০। ‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতায় উল্লিখিত প্রকৃতির পরিবর্তনের পরিচয় দাও।

উত্তর : ‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতায় কবির প্রকাশিত বক্তব্যে প্রকৃতির পরিবর্তন ও বৈশিষ্ট্যের দিক প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর মতে, প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মেই আবর্তিত হয়। মাঘের সন্ন্যাসীর বিদায় দৃশ্য কবির মনকে বিরহকাতর করে রেখেছে। তাই ঋতুরাজ বসন্ত কবির মনে প্রভাব ফেলতে পারেনি। কারণ শীতের সন্ন্যাসীরূপ প্রিয়জন হারানো গভীর বেদনা জমে আছে তাঁর অন্তরজুড়ে। এজন্যই বসন্তের প্রতি কবি উদাসীন। তিনিও অন্যান্যের মতো প্রতিবছর বসন্তের আগমনে বন্দনাগীত রচনা করতেন। কিন্তু কবি এবার সম্পূর্ণ নীরব, নিশ্চুপ। কবির এই উদাসীনতা লক্ষ করে তাঁর ভক্ত বসন্তের প্রশস্তি রচনায় তাকে উদ্বুদ্ধ কার চেষ্টা করলে কবি বলেন, বন্দনাগীত রচনা করে বসন্তকে বরণ না করলেও বসন্ত অপেক্ষা করেনি। ফাল্গুন আসার সাথে সাথেই প্রকৃতি মাতিয়ে বসন্ত এসেছে। অর্থাৎ প্রকৃতির নিয়ম হচ্ছে কেউ বন্দনা করা  না করার মধ্যে কিছু যায় আসে না। প্রাকৃতিক নিয়মেই সে আসে এবং যায়।

 উদ্দীপকের বিষয় :

  1. শোকাচ্ছন্ন মানবমন ও মানবমনের সাথে প্রকৃতির সম্পর্ক।
  2. প্রিয়জনের বিয়োগ ব্যথায় ভারাক্রান্ত হৃদয়।
  3. মানবমনের বিচিত্রতা।
  4. বসন্তের স্তুতি।
  5. প্রিয়জন হারানোর বেদনা।
  6. প্রিয়জনের স্মৃতি রোমন্থন।
  7. শোকাচ্ছন্ন মানবমনে প্রকৃতির প্রভাব।
  8. প্রকৃতির বিচিত্র আয়োজন ও মানববনে তার প্রভাব।
  9. আকস্মিক পিতৃশোকে আনন্দ হয়ে ওঠে বেদনায় নীল।
  10. সুন্দর প্রকৃতির স্পর্শ স্বত:স্ফূর্ততা আনয়ন করে।
  11. বাবার মধুর স্মৃতি বিস্মৃত হওয়ার নয়।
  12. সুফিয়া কামালের রচনা: তাহারেই পড়ে মনে।

সারকথা : ‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতায় কবির প্রিয়জন হারানোর বেদনাবিধুর সুর বেজে উঠেছে। আলোচ্য উদ্দীপকেও একই সুর ধ্বনিত হয়েছে। তাই মন্তব্যটি যথার্থ নয়।

 
নং বিষয় লেখক
আমার পথ কাজী নজরুল ইসলাম
বিড়াল বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
চাষার দুক্ষু বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত
সাম্যবাদী কাজী নজরুল ইসলাম
ঐকতান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ মাইকেল মধূসুদন দত্ত
বায়ান্নর দিনগুলো শেখ মুজিবুর রহমান
অপরিচিতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মাসি-পিসি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
১০ জীবন ও বৃক্ষ মোতাহের হোসেন চৌধুরী
১১ আমি কিংবদন্তির কথা বলছি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ
১২ নেকলেস গী দ্য মোপাসাঁ/ পূর্ণেন্দু দস্তিদার
১৩ রেইনকোট আখতারুজ্জামান ইলিয়াস

 

See More

Like Our Facebook Page.

 

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *