সেই অস্ত্র -আহসান হাবিব

সেই অস্ত্র -আহসান হাবিব

সেই অস্ত্র –আহসান হাবিব

 কবি পরিচিতি :

  • নাম আহসান হাবীব।
  • জন্মপরিচয়  জন্মতারিখ : ২ জানুয়ারি, ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দ
  • জন্মস্থান : শঙ্করপাশা, পিরোজপুর।
  • শিক্ষাজীবন উচ্চ মাধ্যমিক :  আইএ, ব্রজমোহন কলেজ, বরিশাল।
  • কর্মজীবন  সহকারী সম্পাদক – দৈনিক তকবীর, মাসিক বুুলবুল ; ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক – মাসিক সওগাত। স্টাফ আর্টিস্ট – আকাশবাণী, কলকাতা। সাংবাদিকতা – দৈনিক আজাদ, মাসিক মোহাম্মদী, দৈনিক কৃষক, দৈনিক ইত্তেহাদ, সাপ্তাহিক প্রবাহ। সাহিত্য সম্পাদক- দৈনিক পাকিস্তান (পরবর্তীকালে দৈনিক বাংলা)।
  • সাহিত্যকর্ম  কাব্যগ্রন্থ  : রাত্রিশেষ, ছায়াহরিণ, সারা দুপুর, আশায় বসতি, বির্দীণ দর্পণে মুখ প্রভৃতি।
  • গদ্যগ্রন্থ  :  অরণ্যে নীলিমা, রাণী খালের সাঁকো প্রভৃতি।
  • শিশুতোষ গ্রন্থ : ছোটদের পাকিস্তান, বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, ছুটির দিন দুপুরে।
  • পুরস্কার ও সম্মাননা  বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬১), একুশে পদক (১৯৭৮) প্রভৃতি।
  • জীবনাবসান মৃত্যু তারিখ : ১০ জুলাই, ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দ।

 আহসান হাবীবের উপন্যাসসমূহ মনে রাখার উপায়:

জাফরানী রঙের পায়রা হাতে রাণীখালের সাঁকো পাড়ি দিয়ে অরণ্যে নীলিমা প্রবেশ করল।

 কবি  সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:

১৯৫০ এর দিকে তিনি কলকাতা ছেড়ে ঢাকা আসেন।

বেশ কয়েকটি পত্রিকায় কাজ করবার পরে ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি  যোগ  দেন ‘দৈনিক  বাংলা’ (তৎকালীন  ‘দৈনিক পাকিস্তান) পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে।

আমৃত্যু এই পত্রিকার সঙ্গেই তিনি যুক্ত ছিলেন।

 উৎস পরিচিতি :

“সেই অস্ত্র” কবিতাটি আহসান হাবীবের ‘বিদীর্ণ দর্পণে মুখ’ কাব্যগ্রন্থ থেকে সংকলন করা হয়েছে।

 শব্দার্থ ও টীকা:

  • অমোঘ – অব্যর্থ, সার্থক, অবশ্যম্ভাবী।
  • যে অস্ত্র উত্তোলিত হলে পৃথিবীর
  • যাবতীয় অস্ত্র হবে আনত – কবি ভালোবাসা আর শান্তির অস্ত্র দিয়ে সকল মারণাস্ত্রকে পরাভ‚ত করবার আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করেন।
  • যে অস্ত্র উত্তোলিত হলে
  • ফসলের মাঠে আগুন জ্বলবে না-   কবি বিশ্বাস করেন, ভালোবাসা দিয়ে মানুষের হিংসা বিদ্বেষ দূর করা সম্ভব।
  • যে অস্ত্র ব্যাপ্ত হলে নক্ষত্রখচিত আকাশ থেকে আগুন ঝরবে না – কবি এখানে যুদ্ধে ব্যবহৃত ছোট-বড় ক্ষেপনাস্ত্রের কথা বুঝিয়েছেন।
  • ট্রয়নগরী  – প্রাচীন গ্রিসের স্থাপত্যকলায় নন্দিত এক শহর।
  • জাত্যভিমান  –  কোনো যুক্তি ছাড়াই নিজ জাতিকে সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞান করার অহংকারী মনোভাব।
  • সমাবিষ্ট – সমভাবে আবিষ্ট।

 কবিতার ছন্দ বিশ্লেষণ

       

আমাকে সেই অস্ত্র ফিরিয়ে দাও  (১২)

   

সভ্যতার সেই প্রতিশ্র“তি (১০)

    

সেই অমোঘ অনন্য অস্ত্র  (১০)

     

আমাকে ফিরিয়ে দাও। (৮)

বিশ্লেষণ: ‘সেই অস্ত্র’ কবিতাটি অন্ত্যমিলহীন অক্ষরবৃত্ত ছন্দে রচিত। এর বিভিন্ন পংক্তিতে মাত্রাসংখ্যা ১২, ১০, ৮, ৬ ইত্যাদি। এর পর্ববিন্যাসও অসম। কবিতার লয় ধীর।

 সারমর্ম:

এই কবিতায় কবির একমাত্র প্রত্যাশা ভালোবাসা নামের মহান অস্ত্রকে পুনরায় এই মানবসমাজে ফিরে পাওয়া। কবির কাছে ভালোবাসা কেবল কোন আবেগ কিংবা অনুভূতির দ্যোতনা জাগায় না। তাঁর বিশ্বাস, এটি মানুষকে সকল অমঙ্গল থেকে পরিত্রাণের পথ বাতলে দেয়। তাই কবি বিশ্বের মানবকূলের কাছেই এই ভালোবাসা ফিরিয়ে দেবার অনুরোধ করেছেন। মানুষ যদি অপর মানুষের হিংসা, লোভ, ঈর্ষা থেকে মুক্ত থাকে তবে পৃথিবীকে বিরাজ করবে শান্তি ; পৃথিবী এগিয়ে যাবে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির দিকে। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বিদ্বেষের বিষবাস্পকে যদি অপসারণ করতে হয় তবে ভালোবাসা নামক অস্ত্রকে কবির কাছে এবং কবির মতো আরও বহু মানুষের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। কবি জানেন, হিংসা আর স্বার্থপরতার করাল গ্রাসে অনেকেই মানবিকতাশূন্য হয়ে পড়ে। আর তাই কবি মানবিকতার সেই হৃতবোধকে ফিরে পেতে চান তথা মানব সমাজে ফিরিয়ে দিতে চান। পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে চান অফুরান ভালোবাসা।

 পাঠ বিশ্লেষণ

  • আমাকে সেই অস্ত্র ফিরিয়ে দাও
  • সভ্যতার সেই প্রতিশ্র“তি
  • সেই অমোঘ অনন্য অস্ত্র
  • আমাকে ফিরিয়ে দাও।

কবি সভ্যতার প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য সুসভ্যতা গড়ে তোলার সেই হাতিয়ার ফিরে পেতে চান।

 সেই অস্ত্র আমাকে ফিরিয়ে দাও

  • যে অস্ত্র উত্তোলিত হলে
  • পৃথিবীর যাবতীয় অস্ত্র হবে আনত
  • যে অস্ত্র উত্তোলিত হলে
  • অরণ্য হবে আরও সবুজ
  • নদী আরও কলে­ালিত
  • পাখিরা নীড়ে ঘুমোবে।

কবির সেই হাতিয়ার উত্তোলিত হলে জগতের সমস্ত হাতিয়ার নতমুখী হয়ে পড়বে, হয়ে যাবে ভূমিসংলগ্ন। কবির সেই হাতিয়ার উত্তোলিত হলে প্রকৃতির অরণ্য আজকের তুলনায় আরও বেশি সবুজ সতেজ হয়ে উঠবে, নদী হবে আরও বেশি উপকারী মানুষের বন্ধু আর মুক্ত বিহঙ্গরা পারবে আপন আপন আবাসে নির্বিঘেœ ঘুমাতে। বৃক্ষনিধন, নদীভরাট, পাখি শিকার বন্ধ হবে, কবির সেই হাতিয়ার উত্তোলিত হলে।

 যে অস্ত্র উত্তোলিত হলে

  • ফসলের মাঠে আগুন জ্বলবে না
  • খাঁ খাঁ করবে না গৃহস্থালি।

কবির প্রত্যাশিত সেই হাতিয়ার যদি উত্তোলন করা হয়, তাহলে ফসলের মাঠ আর জ্বলে পুড়ে ছারখার হবে না, ফসলশূন্য হবে না। জীর্ণদশায় পড়বে না কৃষকের ঘর গৃহস্থালি।

 সেই অস্ত্র আমাকে ফিরিয়ে দাও

  • যে অস্ত্র ব্যাপ্ত হলে
  • মানব বসতির বুকে
  • মুহুর্তের অগ্ন্যুৎপাত
  • লক্ষ মানুষকে করবে না পঙ্গু- বিকৃত
  • আমাদের চেতনাজুড়ে তারা করবে না আর্তনাদ
  • সেই অস্ত্র যে অস্ত্র উত্তোলিত হলে
  • বার বার বিধ্বস্ত হবে না ট্রয়নগরী।

সেই হাতিয়ার কবি ফিরিয়ে দিবে বলেন, যে হাতিয়ার দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিলে মানবতা ভূলুণ্ঠিত হবে না মানুষের উপর কল্যাণধারা নেমে আসবে। সামান্য সময়ের ব্যবধানে লক্ষ লক্ষ মানুষ মৃত্যুর কোলে আর ঢলে পড়বে না। মানব বসতির কোন স্থান চিরপঙ্গু বিকৃতের দেশে পরিণত হবে না। আর আমাদের চেতনাজুড়ে তারা কেঁদে ফিরবে না। কবির সেই হাতিয়ার যদি উত্তোলিত হয়, তাহলে ট্রয়নগরী বিধ্বস্তের মতো নির্মমতা, ট্র্যাজেডি আর কোথাও সৃষ্টি হবে না।

 আমি সেই অবিনাশী অস্ত্রের প্রত্যাশী

  • যে ঘৃণা বিদ্বেষ অহংকার
  • এবং জাত্যভিমানকে করে বার বার পরাজিত।

কবি সেই চিরন্তন হাতিয়ার ফিরে পেতে চান। সেই হাতিয়ারের ক্ষমতার কাছে মানুষে মানুষে যুদ্ধ বিগ্রহ, ঘৃণা-বিদ্বেষ আত্ম অহংকার, জাতবৈষম্য বারবার পরাজিত হয়।

 যে অস্ত্র আধিপত্যের লোভকে করে নিশ্চিহ্ন

  • যে অস্ত্র মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে না
  •                              করে সমাবিষ্ট
  • সেই অমোঘ অস্ত্র-ভালোবাসা
  • পৃথিবীতে ব্যাপ্ত করো।

অন্য দেশ ও রাজ্য দখল করে আধিপত্য বিস্তারের ঘৃণ্য ইচ্ছাকে, স্পৃহাকে ও লোভকে সেই হাতিয়ার নিশ্চিহ্ন করে দেয়। বিপরীতক্রমে জগতের মানুষকে সমস্ত-মোহমুক্ত করে, বিচ্ছিন্নতার হাত থেকে বাঁচিয়ে এক সারিতে এনে দাঁড় করায়। কবির সেই অবিনশ্বর হাতিয়ার, অমোঘ অস্ত্র-ভালোবাসা। তিনি এই ভালোবাসার অস্ত্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে বলেছেন- জগতের কল্যাণের জন্য, বিশ্বশান্তির জন্য।

 গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (জ্ঞানমূলক):

১। ‘সেই অস্ত্র’ কবিতাটি সংকলন করা হয়েছে- ‘বিদীর্ণ দর্পণে মুখ’ কাব্যগ্রন্থ থেকে।

২। ‘সেই অস্ত্র’ কবিতায় কবির প্রত্যাশা ছিল- একটি (ভালোবাসা নামের মহান অস্ত্রকে মানবসমাজে ফিরে পাওয়া)।

৩। ‘সেই অস্ত্র’ কবিতায় ‘অমোঘ অস্ত্র’ বলতে বোঝানো হয়েছে- অব্যর্থ অস্ত্র।

৪। ‘আমাকে সেই অস্ত্র ফিরিয়ে দাও’ এখানে কবি বলেছেন – অমোঘ অনন্য অস্ত্রের কথা।

৫। কবি যে অস্ত্রের কথা বলেছেন সেই অমোঘ অস্ত্রের নাম – ভালোবাসা।

৬। ‘আমাদের চেতনা জুড়ে তারা করবে না আর্তনাদ।’ ‘সেই অস্ত্র’ কবিতানুসারে আর্তনাদ করবে না- পঙ্গু-বিকৃত মানুষেরা।

৭। ‘সেই অস্ত্র’ কবিতায় উলে­খ আছে – প্রাচীন গ্রিসে অবস্থিত ট্রয়নগরীর কথা।

৮। ট্রয়নগরী বিখ্যাত – স্থাপত্যকলার জন্য।

৯। যুদ্ধের নির্মমতার এক চিরায়ত দৃষ্টান্ত- ট্রয়নগরী।

১০। ঘৃণা, বিদ্বেষ, অহংকার এবং জাত্যাভিমান বার বার পরাজিত হয়- ভালোবাসার কাছে।

১১। ‘জাত্যভিমান’ শব্দের অর্থ – কোন যুক্তি ছাড়াই নিজ জাতিকে সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞান করার অহংকারী মনোভাব।

১২। অমোঘ অস্ত্র ভালোবাসা নিশ্চিহ্ন করে – আধিপত্যের লোভকে।

১৩। সেই অস্ত্র ভালোবাসা বিচ্ছিন্ন করে না – মানুষকে।

১৪। ‘সেই অস্ত্র’ কবিতায় কবির আহ্বান ছিল – অমোঘ অস্ত্র ভালোবাসা, পৃথিবীতে ব্যাপ্ত কর।

১৫। ‘নক্ষত্রখচিত আকাশ থেকে আগুণ ঝরবে না’- এখানে ‘নক্ষত্রখচিত’ বলতে কবি বুঝিয়েছেন- যুদ্ধে ব্যবহৃত ছোট বড় ক্ষেপনাস্ত্র।

১৬। ‘সমাবিষ্ট’ শব্দের অর্থ- সমভাবে আবিষ্ট।

১৭। ‘সেই অস্ত্র’ কবিতায় কবির মতে ভালোবাসা বাতলে দেয় – অমঙ্গল থেকে পরিত্রাণের পথ।

১৮। ‘সেই অস্ত্র’ কবিতার গঠনগত বিশেষত্ব – এর অনাড়ম্বর সহজ গতিময়তা।

১৯। ‘সেই অস্ত্র’ কবিতায় ব্যবহৃত হয়নি – ভারি ধরনের শব্দ।

২০। ‘সেই অস্ত্র’ কবিতাটি এক চিরায়িত প্রার্থনাসংগীত – শান্তিপ্রিয় পৃথিবীবাসীর জন্য।

২১। ‘সেই অস্ত্র’ কবিতাটি রচিত – অক্ষরবৃত্ত ছন্দে।

২২। ‘সেই অস্ত্র’ কবিতাটির পর্বগুলোর বিন্যাস – অসম।

২৩। ‘আমাকে সেই অস্ত্র ফিরিয়ে দাও’ লাইনটি আছে – ১ বার।

২৪। ‘সেই অস্ত্র আমাকে ফিরিয়ে দাও’ লাইনটি আছে- ২ বার।

২৫। ‘যে অস্ত্র উত্তোলিত হলে’ লাইনটি আছে – ৩ বার।

২৬। ‘যে অস্ত্র উত্তোলিত হলে’ বাক্যটি আছে – ৪ বার।

 অনুধাবনমূলক প্রশ্নোত্তর:

১। কবির মতে অরণ্য কীভাবে সবুজ হবে?

উত্তর : কবির মতে প্রকৃতির প্রতি মানুষের ভালোবাসা জন্মালেই অরণ্য সবুজ হবে। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য আর অরণ্য তো প্রকৃতিরই অংশ। তাই অরণ্যের প্রতি মানুষের মধ্যে মমত্ব জাগ্রত করতে হবে যাতে মানুষ কারণে অকারণে অরণ্যকে উজাড় না করে । আর তা হলেই অরণ্য হবে সবুজ।

২। ট্রয়নগরী বার বার বিধ্বস্ত হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা কর।

উত্তর : মানুষের হিংসা আর দম্ভের শিকার হয়ে ট্রয়নগরী তথা মানবসভ্যতা বার বার বিধ্বস্ত হয়। প্রাচীণ গ্রীসের স্থাপত্যকলার এক অনন্য নিদর্শন সুবিশাল নগরী ট্রয়। কিন্তু ভালোবাসাহীন মানুষের হিংসা বিদ্বেষ আর দম্ভের শিকার হয়ে পতন ঘটে মানব ইতিহাসের সুন্দরতম এই নগরীর। ট্রয়নগরী বার বার বিধস্ত হওয়া বলতে কবি বিভিন্ন সভ্যতার পতনের দিকটিকেই ইঙ্গিত করেছেন। মানুষের অমানবিকতা ও নিষ্ঠুরতায় পৃথিবীর অনেক সভ্যতাই কালক্রমে এভাবে হারিয়ে গেছে।

৩। আহসান হাবীবকে মানবদরদি শিল্পী বলা হয়েছে কেন? ব্যাখ্যা কর।

উত্তর : আহসান হাবীবের কবিতায় মানুষের নিত্যদিনের অনুভূতি অনুপুঙ্খভাবে রূপায়িত হয়েছে বলে তাঁকে মানবদরদি শিল্পী বলা হয়েছে। আহসান হাবীব মূলত স্বল্পপরিচিত ও প্রচারবিমুখ কবি হলেও তাঁর কবিতায় মানুষের উচ্চকিত অনুভূতি ব্যাপক গভীরতা পেয়েছে। মানুষের নিত্যজীবনকে তিনি কবিতার আকর হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এ কারণে তাঁকে মানবদরদি শিল্পী বলা হয়েছে।

৪। ‘সেই অস্ত্র’ কবিতায় কীভাবে কবির আশাবাদ প্রকাশিত হয়েছে? ব্যাখ্যা কর।

উত্তর : কবি ভালোবাসার অস্ত্রে সবাইকে পরাভূত করবেন-‘সেই অস্ত্র’ কবিতায় এভাবেই তাঁর আশাবাদ প্রকাশিত হয়েছে। পৃথিবীজুড়ে মানুষ যখন আধিপত্যবাদ ও সা¤্রাজ্যবাদী মনোভাবে আবিষ্ট, তখন কবি মানুষের কাছে ভালোবাসা দিয়েই পৃথিবীর সকল অশুভ শক্তিকে পরাভূত করা সম্ভব। আর এ ভালোবাসাই কবির আশাবাদরূপে এ কবিতায় প্রকাশিত হয়েছে।

৫। কবি ভালোবাসাকে ‘অমোঘ অনন্য অস্ত্র’ বলেছেন কেন?

উত্তর : ভালোবাসা মানুষের সকল অমঙ্গল থেকে উত্তরণের পথ বাতলে দেয়। আমাদের পৃথিবী বিদ্বেষের বিষবাস্পে ভরে গেছে। এই পৃথিবীকে হিংসা, লোভ, ঈর্ষা থেকে মুক্ত করে সুন্দরের দিকে নিয়ে যেতে পারে শুধু ভালোবাসা। বিশ্বের মানবকুলের মঙ্গলে শুধু এই অস্ত্রই কার্যকরী বলে কবি ভালোবাসাকে ‘অমোঘ অনন্য অস্ত্র’ বলেছেন।

৬। “নক্ষত্রখচিত আকাশ থেকে আগুন ঝরবে না।”- বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

উত্তর : “নক্ষত্রখচিত আকাশ থেকে আগুন ঝরবে না”- এ কথাটি দিয়ে কবি যুদ্ধে ব্যবহৃত ছোট বড় ক্ষেপণাস্ত্রকে বুঝিয়েছেন। সভ্যতার জন্য বিজ্ঞান আর্শীবাদ হলেও অমানবিক কাজে এর প্রয়োগ পৃথিবীর জন্য অভিশাপ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। যুদ্ধে মারণাস্ত্রের ব্যবহার পৃথিবীতে মানবজাতির অস্তিত্ব বিপন্ন করেছে। যুদ্ধের সময় বোমারু বিমান থেকে বোমা নিক্ষেপ করে ধ্বংস করা হয় জনপদ, ঐতিহ্য। কবি মানুষের এই নির্মম কর্মকাÐকে জয় করতে চেয়েছেন ভালোবাসার শক্তি দিয়ে। তাই তিনি আলোচ্য কথাটি বলেছেন।

৭। কবি সেই অস্ত্র ফেরত চেয়েছেন কেন?

উত্তর : কবি সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য সেই অস্ত্র ফেরত চেয়েছেন। কবির সেই অস্ত্র হচ্ছে ভালোবাসা। এই পৃথিবীর বুকে ভালোবাসা ব্যাপ্ত হলে হিংসা, দ্বেষ, হানাহানি থাকবে না। মানব অস্তিত্ব আর হুকমির সম্মুখীন হবে না। মানুষে মানুষে সম্প্রীতির বন্ধন তৈরি হবে। এসবরে জন্যই কবি সেই অস্ত্র ফেরত চেয়েছেন।

৮। ‘সেই অস্ত্র’ কবিতাটিকে শান্তিপ্রিয় পৃথিবীবাসীর জন্যে এক চিরায়ত প্রার্থনাসংগীত বলা হয়েছে কেন?

উত্তর : শান্তি প্রিয় মানুষদের প্রত্যাশা ‘সেই অস্ত্র’ কবিতায় ফুটে ওঠায় কবিতাটিকে পৃথিবীবাসীর জন্যে এক চিরায়ত প্রার্থনাসংগীত বলা হয়েছে। প্রার্থনাসঙ্গীতে মানুষ তার সবচেয়ে জিনিসটি পাওয়ার আকুল আবেদন জানায়। মানুষের এই কাঙ্খিত বস্তু হচ্ছে শান্তি। ‘সেই অস্ত্র’ কবিতাটিতে কবি ভালোবাসার অস্ত্রের প্রত্যাশা করেছেন। এই অস্ত্রের মাধ্যমে তিনি পৃথিবীতে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি আনয়নের কথা বলেছেন। এ কারণেই কবিতাটিকে শান্তিপ্রিয় পৃথিবীবাসী জন্যে এক চিরায়ত প্রার্থনাসঙ্গীত বলা হয়েছে।

৯। ‘যে অস্ত্র উত্তোলিত হলে পৃথিবীর যাবতীয় অস্ত্র হবে আনত’- বলতে কী বোঝায়?

উত্তর : ভালোবাসা নামক অস্ত্রটি উত্তোলিত হলে পৃথিবীর ধবংসের জন্যে যে অস্ত্রগুলো সৃষ্টি হয়েছিল সেগুলো ব্যবহারের পরিসমাপ্তি ঘটবে। প্রাচীণকালে মানুষ আত্মরক্ষার জন্যে অস্ত্রের ব্যবহার শুরু করেছিল। কিন্তু এখন মানুষ ক্ষমতা আর আধিপত্য বিস্তারে জন্যেই অস্ত্রের ব্যবহার করে। এসব অস্ত্রের কারণে মানবজাতি ও পৃথিবী দুইই বিপন্ন। তাই ভালোবাসা নামক অস্ত্রটি আনার কথা বলা হয়েছে, তাহলে মানবজাতির কল্যাণ সাধিত হবে।

১০। পাখিরা নীড়ে ঘুমাবে- বুঝিয়ে লেখ।

উত্তর : পরিবেশ যদি শান্ত থাকে তাহলে পাখিরা নিজেদের নীড়ে ঘুমোবে। মানুষের সৃষ্ট কাজে বনের গাছপালা ধবংস হওয়ার সাথে সাথে প্রাকৃতিক পরিবেশও বিনষ্ট হচ্ছে। নিরুপদ্রব বাসস্থানের অভাব দেখা দিচ্ছে বন্য প্রাণীগুলোর। তাই মানুষের মধ্যে যদি ভালোবাসার সৃষ্টি হয় তাহলে মানুষের আচার-আচরণে পরিবর্তন আসবে, মানুষ ধ্বংসাত্মক কাজ থেকে বিরত থাকবে এবং শান্তিময় পরিবেশে পাখিরা তাদের নীড়ে ঘুমাতে পারবে।

 উদ্দীপকের বিষয় :

  1.  ভালোবাসার শক্তি।
  2. অস্ত্রের বিভিন্নতা।
  3. সুন্দর পৃথিবী গড়ার অঙ্গীকার।
  4. শক্তির দাপট নয়, ভালোবাসাই জীবনে বরণীয়।
  5. ক্ষমতার দন্ডে নৃশংসতা।
  6.  মানুষকে একতাবদ্ধ করতে ভালোবাসার গুরুত্ব।
  7. জাতিভেদ সবুজের সমারোহে ভরিয়ে দেওয়ায় প্রত্যয়।
  8. সত্যিকারের দেশনেতা।
  9. দখলকারীদের অত্যাচারের চিত্র।
  10. প্রকৃতিকে ভালোবাসার আহ্বান।

 সারকথা : ‘সেই অস্ত্র’ কবিতা এবং উদ্দীপকের বর্ণনায় হিংসা-বিদ্বেষ ও মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে। এর জন্য দায়ী ভালোবাসাহীন মানুষ ও সহিংস মনোভাব।

 কবিতার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:

  • মোট লাইন সংখ্যা → “৩১ লাইন”
  • মোট যতিচিহ্ন → ৮টি (৩ প্রকার)
  • হাইফেন → ১টি
  • ড্যাস → ১টি
  • পূর্ণচ্ছেদ → ৬টি
  • অস্ত্র → ১৪ বার
  • অস্ত্রের → ১ বার (অস্ত্র + অস্ত্রের = ১৫ বার)
  • সেই অস্ত্র আমাকে ফিরিয়ে দাও → ২ বার
  • সেই অস্ত্র আমাকে ফিরিয়ে দাও → ২ বার
  • আমাকে সেই অস্ত্র ফিরিয়ে দাও → ১ বার
  • আগুন → ২ বার
  • অমোঘ → ২ বার

 অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শব্দ:

অরণ্য, নদী, সবুজ, গৃহস্থালি, নক্ষত্রখচিত আকাশ, অগ্ন্যুৎপাত, ট্রয়নগরী, ভালোবাসা।

 কবিতার অন্তনির্হিত তাৎপর্য:

  1. ভালোবাসা সর্বজয় :  “আমাকে সেই অস্ত্র ফিরিয়ে দাও”
  2. সম্প্রীতি ও সাম্যের চেতনা :  “যে অস্ত্র মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে না…….পৃথিবীতে ব্যাপ্ত করো।”
  3. ভালোবাসার স্বরূপ  : “যে অস্ত্র উত্তোলিত হলে পৃথিবীর যাবতীয় অস্ত্র হবে আনত।”
  4. দুর্ভোগের অবসান : “যে অস্ত্র উত্তোলিত হলে ফসলের মাঠে আগুন জ্বলবে না।”
  5. যুদ্ধ নয় শান্তি  : “মানব বসতির বুকে…লক্ষ লক্ষ মানুষকে করবে না পঙ্গু-বিকৃত।” এবং যে অস্ত্র উত্তোলিত হলে….সেই অস্ত্র আমাকে ফিরিয়ে দাও।”
  6. নির্মল-নিসর্গের আহ্বান : “আমাকে সেই অস্ত্র ফিরিয়ে দাও…আমাকে ফিরিয়ে দাও।”
  7. ভালবাসার অমোঘ শক্তি : “সেই অস্ত্র আমাকে ফিরিয়ে দাও……পাখিরা নীড়ে ঘুমোবে।”
  8. ভালোবাসাই সর্বজয়ী  : “যে অস্ত্র ব্যাপ্ত হলে….বার বার বিধ্বস্ত হবে না ট্রয়নগরী।”
  9. ভালোবাসা শাশ্বত  : “আমি সেই অবিনাশী অস্ত্রের প্রত্যাশী….পৃথিবীতে ব্যাপ্ত করো।”

 ব্যাকরণ অভীক্ষা

  1. উপসর্গ   :  প্রতিশ্র“তি, অমোঘ, আনত, ব্যাপ্ত,  অবিনাশী, বিদ্বেষ, পরাজিত, সমবিষ্ট।
  2. সন্ধি সাধিত শব্দ : ব্যাপ্ত, অগ্ন্যূৎপাত, অহংকার, জ্যাত্যভিমান, নিশ্চিহ্ন, বিচ্ছিন্ন।
  3. বিদেশি শব্দ : সবুজ =ফারসি শব্দ।

 ব্যাসবাক্যসহ সমাস নির্ণয়:

প্রদত্ত শব্দ  ↔    ব্যাসবাক্য    ↔    সমাসের নাম

নক্ষত্র খচিত  ↔   নক্ষত্র দ্বারা খচিত  ↔     তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস

আনত    ↔     ঈষত নত    ↔      অব্যয়ীভাব সমাস

  • প্রথম লাইন :  “আমাকে সেই অস্ত্র ফিরিয়ে দাও”
  • শেষ লাইন : “পৃথিবীতে ব্যাপ্ত করো।”
নং বিষয় লেখক
আমার পথ কাজী নজরুল ইসলাম
বিড়াল বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
চাষার দুক্ষু বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত
সাম্যবাদী কাজী নজরুল ইসলাম
ঐকতান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ মাইকেল মধূসুদন দত্ত
বায়ান্নর দিনগুলো শেখ মুজিবুর রহমান
অপরিচিতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মাসি-পিসি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
১০ জীবন ও বৃক্ষ মোতাহের হোসেন চৌধুরী
১১ আমি কিংবদন্তির কথা বলছি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ
১২ নেকলেস গী দ্য মোপাসাঁ/ পূর্ণেন্দু দস্তিদার
১৩ রেইনকোট আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
১৪ নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায় সৈয়দ শামসুল হক
১৫ তাহারেই পড়ে মনে সুফিয়া কামাল
১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ শামসুর রাহমান
১৭ রক্তে আমার অনাদি অস্থি  দিলওয়ার খান

 

See More

Like Our Facebook Page.

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *