আমার পথ- কাজী নজরুল ইসলাম

আমার পথ- কাজী নজরুল ইসলাম

 


মূলভাব:

আমার কর্ণধার আমি। আমাকে পথ দেখাবে আমার সত্য। আমার যাত্রা শুরুর আগে আমি সালাম জানাচ্ছি। নমস্কার করছি আমার সত্যক। যে পথ আমার সত্যের বিরোধী, সে পথ আর কোনো পথই আমার বিপথ নয়। রাজভয় লোকভয় কোন ভয়েই আমাকে বিপথে নিয়ে যেতে পারবে না। আমি যদি সত্য ভাবে আমার সত্যকে চিনে থাকি আর আমার অন্তরে মিথ্যার ভয় থাকে না তাহলে বাইরের কোন ভয়েই আমার কিছু করতে পারবে না। যার ভিতরে ভয় তারাই বাইরে ভয় পায়। যার মনে মিথ্যা সেইতো মিথ্যাকে ভয় পাবেই। নিজেকে চিনলে মানুষের মনে আপনা আপনি একটি বড় জোর আসে যে সে আপন সত্য ছাড়া আর কাউকে কুর্নিশ করে না। অর্থাৎ কেই তাকে ভয় দেখিয়ে পদানত করতে পারে না। ভুল স্বীকারের মাধ্যমে আত্মাকে জানা যায় বলে ‘আমার পথ- কাজী নজরুল ইসলাম’ প্রবন্ধের প্রাবন্ধিক ভুল করতে রাজি আছেন। সত্যকে জানতে আত্মাকে জানার জন্য ভুল সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। ভুলের মাধ্যমেই কোন ব্যক্তি নিজেকে জানতে পারে এবং নিজেকে সংশোধনও করতে পারে। কিন্তু ভুল করে যদি তা স্বীকার করা না হয়, তবে তা হয় ভণ্ডামির শামিল। প্রাবন্ধিক এরূপ ভণ্ডামি করতে রাজি নন। তাই বলা যায়, আত্মকে জানার জন্যেই প্রাবন্ধিক ভুল করতে রাজি আছেন। সত্য জানা ও আত্মাশক্তির বিকাশের মাধ্যমে আত্মনির্ভরতা আসে। অন্যের ওপর নির্ভর বেঁচে থাকাকে বলা হয় পরনির্ভরতা। যার নিচের শক্তির ওপর বিশ্বাস নেই, যে আত্মশক্তি ও সত্যকে জানে না সে-ই পরনির্ভর। লেখকের মতে, পরনির্ভরশীলতাকে বর্জন করতে হলে নিজের সত্যকে জানতে হবে, নিজের শক্তির ওপর আত্মা স্থাপন করতে হবে। আর তা হলেই মানুষ হয়ে উঠবে আত্মনির্ভরশীল। এভাবেই আত্মনির্ভরতা আসে।


সারমর্ম

আমার পথ- কাজী নজরুল ইসলাম প্রবন্ধে নজরুল এমন এক ‘আমি’র আবাহন প্রত্যাশা করেছেন যার পথ সত্যের পথ; সত্য প্রকাশে তিনি নির্ভীক অসংকোচ। তাঁর এই ‘আমি’-ভাবনা বিন্দুতে সিন্ধুর উচ্ছ্বাস জাগায়। নজরুল প্রতিটি মানুষকে পূর্ণ এক ‘আমি’র সীমায় ব্যপ্ত করতে চেয়েছেন; একই সঙ্গে এক মানুষকে আরেক মানুষের সঙ্গে মিলিয়ে ‘আমরা’ হয়ে উঠতে চেয়েছেন। তিনি তাই অনায়াসে বলতে পারেন, ‘আমার কর্ণধার আমি। আমার পথ দেখাবে আমার সত্য।’ নজরুলের কাছে ভগ্ন আত্মবিশ্বাসের গ্লানি গ্রহণযোগ্য নয়। এর পরিবর্তে তিনি প্রয়োজনে দাম্ভিক হতে চান; কেননা তাঁর বিশ্বাস, সত্যের দম্ভ যার মধ্যে রয়েছে তার পক্ষেই কেবল অসাধ্য সাধন করা সম্ভব। নজরুল এই প্রবন্ধে দেখিয়েছেন যে, তিনি ভুল করতে রাজি আছেন কিন্তু ভন্ডামি করতে প্রস্তুত নন। ভুল জেনেও তাকে ঠিক বলে চালিয়ে দেবার কপটতা কিংবা জেদ তাঁর দৃষ্টিতে ভন্ডামি। এই ভুল ব্যক্তির হতে পারে, সমাজের হতে পারে কিংবা হতে পারে কোন প্রকার বিশ্বাসের। তবে তা যারই হোক এর থেকে বেরিয়ে আসাই নজরুলের একান্ত প্রত্যাশা। তিনি জানেন, এই বেরিয়ে আসা সম্ভব হলেই মানুষের সঙ্গে মানুষের প্রাণের সম্মিলন ঘটানো সম্ভব হবে। মানুষ্যত্ববোধে জাগ্রত হতে পারলেই ধর্মের সত্য উম্মোচিত হবে, এক ধর্মেও সঙ্গে অপর ধর্মেও বিরোধ মিটে যাবে। সম্ভব হবে গোটা মানব সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করা; আর এই ঐক্যের মূল শক্তি হলো সম্প্রীতি।


লেখক পরিচিতি :

আমার পথ- কাজী নজরুল ইসলাম এর ডাক নাম – দুখু মিয়া, ছদ্মনাম: ধূমকেতু, জন্মপরিচয় জন্মতারিখ : ২৫শে মে, ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দ (১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩০৬ বঙ্গাব্দ)। জন্মস্থান : বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রাম। পিতৃ ও মাতৃপরিচয় পিতার নাম : কাজী ফকির আহমদ। মাতার নাম : জাহেদা খাতুন। শিক্ষাজীবন প্রাথমিক শিক্ষা : গ্রামের মক্তব থেকে প্রাথমিক শিক্ষালাভ। মাধ্যমিক : প্রথমে রানীগঞ্জের সিয়ারসোল স্কুল। সর্বশেষ ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালের দরিরামপুর স্কুলে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়া লেখা করেন কর্মজীবন/পেশা প্রথম জীবনে জীবিকার তাগিদে তিনি কবি দলে, রুটির দোকানে এবং সেনাবাহিনীতে যোগদান করেছিলেন। পরবর্তীতে পত্রিকা সম্পাদনা, গ্রামোফোন রেকর্ডের ব্যবসায়, গান লেখা ও সুরারোপ এবং সাহিত্য সাধনা। সাহিত্যকর্ম কাব্যগ্রন্থ : অগ্নি-বীণা, বিষের বাঁশী, ভাঙার গান, সাম্যবাদী, সর্বহারা, ফণি-মনসা, জিঞ্জীর, সন্ধ্যা, প্রলয়শিখা, দোলনচাঁপা, ছায়ানট, সিন্ধু হিল্লোল, চক্র`বাক। উপন্যাস : বাঁধনহারা, মৃত্যুক্ষুধা, কুহেলিকা। গল্প : ব্যথার দান, রিক্তের বেদন, শিউলিমালা, জিনের বাদশা। নাটক : ঝিলিমিলি, আলেয়া, পুতুলের বিয়ে। প্রবন্ধগ্রন্থ : যুগ-বাণী, দুর্দিনের যাত্রী, রাজবন্দীর জবানবন্দী, ধূমকেতু। জীবনীগ্রন্থ : ‘মরুভাস্কর’ (হযরত মুহম্মদ (স) এর জীবনীগ্রন্থ)। অনুবাদ : ‘রুবাইয়াত-ই-হাফিজ’, ‘রুবাইয়াত-ই-ওমর খৈয়াম’। গানের সংকলন : বুলবুল, চোখের চাতক, চন্দ্রবিন্দু, নজরুল গীতি, সুরলিপি, গানের মালা, চিত্তনামা ইত্যাদি। সম্পাদিত পত্রিকা : ধূমকেতু, লাঙ্গল, দৈনিক নবযুগ।
পুরস্কার/সম্মাননা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ‘জগত্তারিণী স্বর্ণপদক’ ভারত সরকার প্রদত্ত ‘পদ্মভূষণ’ উপাধি লাভ। রবীন্দ্রভারতী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কবিকে ডি-লিট ডিগ্রি প্রদান করে। তাছাড়া ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ সরকার কবিকে ‘একুশে পদক’ প্রদান এবং জাতীয় কবির মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেন। জীবনাবসান মৃত্যু তারিখ : ২৯ আগস্ট, ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দ।সমাধিস্থান : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণ।


কাজী নজরুল ইসলামের রচনাসমূহ মনে রাখার উপায়

প্রবন্ধ : দুর্দিনের যাত্রী রুদ্রমঙ্গল যুগবাণী পত্রিকার রাজবন্দীর জবানবন্দী প্রকাশ করে।
নাটক : আলেয়া ঝিলিমিলি কাপড়পড়ে মধুমালাকে সঙ্গে নিয়ে পুতুলের বিয়েতে যায়।
উপন্যাস : মৃত্যুক্ষুধার কুহেলিকা বাঁধন হারা হলো।
কাব্যগ্রন্থ : শেষ সওগাত পড়ে জানতে পারলাম সন্ধ্যা রাতে নতুন চাঁদের আলোয় ছায়ানটে ভাঙ্গার গান গাইবে সাতভাই চম্পা।
সেখানে অগ্নি-বীণা ও বিষের বাঁশিতে সর্বহারা মানুষের ঝড় ও সাম্যবাদের সুর উঠবে। গতকাল পুবের হাওয়ার কারণে মরুভাস্করের উপর দিয়ে প্রলয় শিখা বয়ে যাওয়ায় ভয়ে আজ দোলনচাপা ও সিন্ধু হিলে­াল নদীর তীর থেকে ফণিমনসা ও ঝিঙে ফুল ভুলতে যায়নি।


লেখক সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য :

নজরুলের মোট নিষিদ্ধ গ্রন্থ ৫টি। যেমন-বিষের বাঁশি, ভাঙার গান, প্রলয় শিখা, চন্দ্রবিন্দু, যুগবাণী।
বাংলাদেশের রণসঙ্গীতের রচয়িতা – কাজী নজরুল ইসলাম।
রণসঙ্গীত হিসেবে মূল কবিতার গৃহীত চরণ – ২১টি।
রণসঙ্গীতটি ঢাকার ’শিখা’ পত্রিকায় ১৯২৮ (১৩৩৫) বার্ষিক সংখ্যায় প্রকাশিত হয় – ’নতুনের গান’ শিরোনামে।
নজরুলের রণসঙ্গীতটি যে কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত – সন্ধ্যা।
ধূমকেতু পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের ’আয় চলে আয়, রে ধূমকেতু/ আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু’ – বাণী ছাপা হয়।
তিনি গ্রেফতার হন ধূমকেতুর পূজা সংখ্যায় (২৬ শে সেপ্টেম্বর,১৯২২)-আনান্দময়ীর আগমনে প্রকাশিত হলে।
জেলে বসে লেখা প্রবন্ধগ্রন্থের নাম’ রাজবন্দীর জবানবন্দী’ রচনার তারিখ: (৭/১/১৯২৩)।
সঞ্চিতা উৎসর্গ করা হয় – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে।


কাজী নজরুলের প্রথম প্রকাশিত সাহিত্য কর্ম ।

প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ – ’ব্যথার দান’ (প্রকাশ;  ফেব্রুয়ারি ১৯২২)।
প্রথম প্রকাশিত রচনা – ’বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী’ (প্রকাশ; জ্যৈষ্ঠ ১৩২৬; সওগাত)।
প্রথম প্রকাশিত কবিতা – ’মুক্তি’ (প্রকাশ ; শ্রাবণ ১৩২৬; বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পত্রিকা।
প্রথম প্রকাশিত গল্প – ’বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী’ (প্রকাশ : জ্যৈষ্ঠ ১৩২৬)।
প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ – ’ব্যথার দান’ (প্রকাশ ; ফেব্রুয়ারি ১৯২২)।
প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ – ’অগ্নি – বীণা’ (সেপ্টেম্বর, ১৯২২)।
প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস- বাঁধন – হারা’ (১৯২২)।
প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধ – ’তুর্কি মহিলার ঘোমটা খোলা’ (প্রকাশ ; কার্তিক ১৩২৬)।
প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ ‘যুগবানী’ (অক্টোবর ১৯২২)।
প্রথম নিষিদ্ধগ্রন্থ – ’বিষের বাঁশি’ (প্রকাশ ; আগষ্ট ১৯২৪/নিষিদ্ধঃ ২৪শে অক্টোবর ১৯২৪)।

 


উৎস পরিচিতি
“প্রবন্ধটি কাজী নজরুল ইসলামের সুবিখ্যাত প্রবন্ধগ্রন্থ ‘রুদ্র – মঙ্গল’ থেকে সংকলিত হয়েছে।

মূলবাণী/মর্মবাণী/উপজীব্য বিষয়: সত্যকে ধারণ করা।

অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় :
সত্য সম্পর্কে ধারণা লাভ করে বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করতে পারবে।
সত্যকে জেনে নিজেকে চেনার জ্ঞান লাভ করবে।
স্বাবলম্বনের সুফল এবং পরাবলম্বনের কুফল সম্পর্কে জানতে পারবে।
আত্মনির্ভরতা অর্জনে আত্মাকে চেনার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারবে।
পুরনোকে ধ্বংসের মাধ্যমে কীভাবে বিপ্লব সফল করতে হয়- সে সম্পর্কে ধারণা লাভ করবে।
মিথ্যা ও মেকির পর বর্জন করে নিজের চেনা সত্যকে গ্রহণ করতে পারবে।
ভুলকে অকপটে স্বীকার করার শিক্ষা অর্জন করতে পারবে।
সংকীর্ণতা, হিংসা, বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতামুক্ত সমাজ গঠনে আত্মপ্রত্যয়ী ও তৎপর হবে।


শব্দার্থ ও টীকা

কর্ণধার – নেতৃত্ব প্রধানের সামর্থ্য আছে এমন ব্যক্তি।
কুর্নিশ – অভিবাদন।
মেকি – মিথ্যা।
সম্মার্জনা – মেজে ঘষে পরিষ্কার করা।
আগুনের ঝান্ডা – অগ্নিপতাকা।

নমস্কার – প্রণাম।
বিপথ – ভুল পথ।
কান্ডারী – মাঝি, কর্ণধার।
অহংকার – অহমিকা, গর্ব।
স্বাবলম্বন – আÍনির্ভব, স্বনির্ভরতা।
উদ্ধার – পরিত্রাণ, নিষ্কৃতি।
ইমারত – দালান, পাকাবাড়ি।
বৈষম্য – বৈসাদৃশ্য, ভিন্নতা, অসমতা।
অন্যতম – অনেকের মধ্যে এক, বহুর মধ্যে এক।


বানান সর্তকতা:
আমার পথ- কাজী নজরুল ইসলাম  এর গুরুত্বপূর্ণ বানান:  নমস্কার, স্বীকারোক্তি, পৌরুষ, কাণ্ডারি, স্পর্ধা, স্বাবলম্বন, মহাত্মা, গান্ধীজি, নিস্ক্রিয়, পরাবলম্বন, ভণ্ডামি, সম্মাজনা, প্রশংসা, বৈষম্য, শ্রদ্ধা।

 


গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর:

১. লেখককে পথ দেখাবে তার – সত্য।
২. যাত্রা শুরুর আগে লেখক সালাম ও নমস্কার জানিয়েছেন – সত্যকে।
৩. লেখক সত্যকে সালাম জানিয়েছেন – যাত্রা শুরু করার আগে।
৪. ‘সে পথ ছাড়া আর কোন পথই আমার বিপথ নয়’ – এখানে ‘সে পথ’ বলতে প্রাবন্ধিক বুঝিয়েছেন – সত্যের বিরোধী পথ।
৫. ‘আমার পথ’ প্রবন্ধ অনুসারে প্রাবন্ধিককে বিপথে নিয়ে যাবে না – রাজভয় ও লোকভয়।
৬. ভুলের মাধ্যমে আমরা পেতে পারি – সত্য।
৭. যার মনে মিথ্যা সেই মিথ্যাকে – ভয় করে।
৮. মিথ্যার ভয়কে জয় করতে প্রয়োজন – নিজেকে চেনা।
৯. সবচেয়ে বড় দাসত্বের পথ – পরাবলম্বন হওয়া।
১০. ‘গান্ধীজি আছেন’ বলতে বোঝানো হয়েছে – পরাবলম্বন।
১১. ‘আমার পথ’ প্রবন্ধে পরিহার করতে বলা হয়েছে – ভণ্ডামি।
১২. প্রাবন্ধিক আমার পথ বলতে বুঝিয়েছেন – সত্যের পথ।
১৩. প্রাবন্ধিকের মতে ভুল করার চেয়েও নিকৃষ্ট কাজ – ভণ্ডামি করা।
১৪. মানুষের সঙ্গে মানুষের প্রাণের মিলন ঘটে – মানব ধর্ম পালনে।
১৫. আগুনের সম্মার্জনা প্রয়োজন – মিথ্যাকে দূর করতে।
১৬. কারও বাণীকে বেদবাক্য বলে মেনে নেয়া যায়, যদি তা – প্রাণের সাড়া দেয়।
১৭. সত্যের অগ্নিশিখাকে নিভিয়ে দেয় – মিথ্যার জল।
১৮. পথ নির্দেশক সত্য অবিনয়কে মানতে পারেন, কিন্তু সহ্য করতে পারেন না – অন্যায়।
১৯. ‘আমার পথ’ প্রবন্ধে ‘আমি’ ভাবনা বিন্দুতে উচ্ছ¡াস জাগায় – সিন্ধুর।
২০. ‘আমার পথ’ প্রবন্ধে যে মহাপুরুষের উলে­খ আছে- মহাত্মা গান্ধী।
২১. ‘আমার পথ’ প্রবন্ধটি নেওয়া হয়েছে – রুদ্রমঙ্গল প্রবন্ধ থেকে।
২২. ‘আমার পথ’ প্রবন্ধে লেখক এক মানুষ, আরেক মানুষের সাথে মিলিয়ে হতে চেয়েছেন – আমরা।
২৩. আমার পথ প্রবন্ধের মূল বিষয় – আত্মসত্য অর্জন।
২৪. ভারতীয়দের আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন – মহাত্মা গান্ধী।
২৫. প্রাণ প্রাচুর্যের উৎস বিন্দু – সত্যের উপলদ্ধি।
২৬. অতিরিক্ত বিনয় মানুষকে – ছোট করে।
২৭. লেখক ভুল করতে রাজি হলেও রাজি নন – ভণ্ডামি করতে।
২৮. উৎকৃষ্ট মানব সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব- স¤প্রীতির মধ্য দিয়ে।
২৯. মেকি শব্দের অর্থ – মিথ্যা বা কপট।
৩০. সম্মার্জনা শব্দের অর্থ – মেজে ঘষে পরিস্কার করা।

৩১. ‘অগ্নি-বীণা’ উৎসর্গ করা হয় – বিপ্লবী বারিন্দ্রকুমার ঘোষকে।
৩২. অগ্নি-বীণার প্রথম কবিতা – ’প্রলয়োল্লাস’।
৩৩. নজরুলের কোনটি পত্রোপন্যাসের পর্যায়ভুক্ত – বাঁধন-হারা।
৩৪. নজরুল মস্তিষ্কের ব্যাধিতে আক্রান্ত হন – ১৯৪২ এর ১০ই অক্টোবর।
৩৫. বঙ্গবন্ধু সরকার কর্তৃক রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে নজরুলকে কলকাতা থেকে ঢাকায় আনয়ন করা হয় – ১৯৭২ এর ২৪ শে মে এবং এরপর থেকে নজরুল বাংলাদেশেই ছিলেন।
৩৬. তিনি বার বছর বয়সে কোথায় যোগ দেন? – লেটোর দলে এবং দলে ’ পালা গান’ রচনা করেন।
৩৭. নজরুল কোন দৈনিক পত্রিকার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন? – ’সন্ধ্যা, দৈনিক নবযুগ’ (১৯২০) – এর।
৩৮. এই পত্রিকার সঙ্গে আর কোন দু’জন রাজনৈতিক নেতা যুক্ত ছিলেন? – কমরেড মুজাফ্ফর আহমদ ও শেরে বাংলা ফজলুল হক।
৩৯. তাঁর সম্পাদনায় কোন অর্ধ সাপ্তাহিক পত্রিকা বের হত? – ধূমকেতু (১৯২২)।
৪০. নজরুলকে জাতীয় সংবর্ধনা দেয়া হয় কোথায় এবং কখন? – ১৯২৯ – এর ১৫ই ডিসেম্বর কলকাতার অ্যালবার্ট হলে।
৪১. কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী – সৈয়দা খাতুন (নার্গিস)।
৪২. কাজী নজরুল ইসলামের স্ত্রীর নাম – আশালতা সেনগুপ্ত (প্রমিলা)। উলে­খ্য যে, নজরুল আশালতা সেনগুপ্তকে ’প্রমিলা’

প্রথম লাইন – আমার কর্ণধার আমি।
শেষ লাইন – সম্ভব হবে গোটা মানব সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করা; আর এই ঐক্যের মূল শক্তি হলো সম্প্রীতি।


অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর :

১। ‘আমার পথ- কাজী নজরুল ইসলাম’ প্রবন্ধের প্রাবন্ধিক দাম্ভিক হতে চান কেন?
উত্তর : ‘দম্ভ’ আত্মাকে চেনার সহজ স্বীকারোক্তি হওয়ায় ‘আমার পথ’ প্রবন্ধের প্রাবন্ধিক দাম্ভিক হতে চান। ‘আমার পথ’ প্রবন্ধে বর্ণিত প্রাবন্ধিক চিরকাল নিজেকে চেনার চেষ্টা করেছেন। নিজেকে চেনা, নিজ সত্যের পথপ্রদর্শককে জানার মাঝে তিনি কোন অহংকার খুঁজে পাননি। আর কেউ যদি এই নিজ সত্যকে জানার আকাঙ্খাকে দম্ভ মনে করে তবে প্রাবন্ধিক দাম্ভিক হতে চান। মূলত নিজেকে জানার জন্যেই প্রাবন্ধিক দাম্ভিক হতে চান।

২। কাজী নজরুল ইসলাম হিন্দু মুসলমানদের মিলনের অন্তরায় দূর করতে চেয়েছিলেন কেন?
উত্তর : মানবধর্মকে সবচেয়ে বড় ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করায় কাজী নজরুল ইসলাম হিন্দু মুসলমানের মিলনের অন্তরায় দূর করতে চেয়েছিলেন। কাজী নজরুল ইসলাম আজীবন মানবধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর কাছে মানবধর্মই ছিল সবচেয়ে বড় ধর্ম। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু মুসলমানের মিলনের অন্তরায় বা ফাঁকি কোনখানে তা দেখিয়ে দিয়ে এর গলদ দূর করা এবং দেশব্যাপী মানবধর্ম তথ্য সব ধর্মের মানুষের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করা। আর এ কারণেই তিনি হিন্দু মুসলমানের মিলনের অন্তরায় দূর করতে চেয়েছিলেন।

৩। কাজী নজরুল ইসলাম এর মতে, দেশের দীর্ঘদিনের পরাধীনতার কারণ ব্যাখ্যা কর।
উত্তর : কাজী নজরুল ইসলামের মতে, আত্মনির্ভরশীলতার অভাবই দেশের দীর্ঘদিনের পরাধীনতার কারণ। কাজী নজরুল ইসলাম মনে করেন, আত্মাকে চিনলেই আত্মনির্ভরতা আসে। তিনি বিশ্বাস করেন, এই আত্মনির্ভরতা যেদিন সত্যি সত্যিই আমাদের আসবে, সেই দিনই আমরা স্বাধীন হব। কিন্তু আমরা সেদিন নিজের প্রতি বিশ্বাস না রেখে গান্ধীজির মতো মহাপুরুষের ওপর নির্ভর করেছিলাম। ফলে আমাদের স্বাধীনতা অর্জন বিলম্বিত হয়েছিল। অর্থাৎ স্পষ্টতা বোঝা যায় কাজী নজরুল ইসলাম আত্মনির্ভরশীলতা অভাবকেই পরাধীনতার কারণ হিসেবে দায়ী করেছেন।

৪। ‘আমার কর্ণধার আমি’ উক্তিটি দ্বারা প্রাবন্ধিক কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর : ‘আমার কর্ণধার আমি’ উক্তিটি দ্বারা প্রাবন্ধিক নিজের ওপর কর্তৃত্বের গুরুত্বকে বুঝিয়েছেন। সমাজের প্রত্যেকেই একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতা স্বাধীন মত প্রকাশে বাধার সৃষ্টি করে। একে অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ে। কিন্তু নিজের ওপর কর্তৃত্ব থাকলে অনেক কাজ সহজেই করা যায়। ‘আমার কর্ণধার আমি’ উক্তিটি দ্বারা প্রাবন্ধিক নিজের ওপর নিজের কর্তৃত্বের এ গুরুত্বকেই বুঝিয়েছেন।

৫। ‘আমার পথ’ প্রবন্ধে বর্ণিত প্রাবন্ধিক কেন ভুল করতে রাজি আছেন?
উত্তর : ভুল স্বীকারের মাধ্যমে আত্মাকে জানা যায় বলে ‘আমার পথ’ প্রবন্ধের প্রাবন্ধিক ভুল করতে রাজি আছেন। সত্যকে জানতে আত্মাকে জানার জন্য ভুল সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। ভুলের মাধ্যমেই কোন ব্যক্তি নিজেকে জানতে পারে এবং নিজেকে সংশোধনও করতে পারে। কিন্তু ভুল করে যদি তা স্বীকার করা না হয়, তবে তা হয় ভণ্ডামির শামিল। প্রাবন্ধিক এরূপ ভণ্ডামি করতে রাজি নন। তাই বলা যায়, আত্মকে জানার জন্যেই প্রাবন্ধিক ভুল করতে রাজি আছেন।

৬। প্রাবন্ধিক সত্যকে সত্যি করে চিনতে চেয়েছে কেন?
উত্তর : আপন সত্যকে না চিনলে দাসত্ববৃত্তি এবং পরাবলম্বন থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না বলে প্রাবন্ধিক সত্যকে সত্যি করে চিনতে চেয়েছেন। সত্যই সকল তাপশক্তিকে পরাজিত করে পূর্ণতার পথে নিয়ে যায়। সত্যকে ভালো করে জানতে না পারলে তা অধরাই থেকে যাবে। মিথ্যা ও ভনিতার বেড়াজালে ছিন্ন করে আলোর পথ খোঁজা সম্ভব হবে না, পরাবলম্বন এবং দাসত্ব শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকতে হবে। তাই প্রাবন্ধিক সত্যকে সত্যি করে চিনতে চেয়েছেন।

৭। রাজভয়, লোকভয় কেন প্রাবন্ধিককে বিপথে নিয়ে যাবে না?
উত্তর : প্রাবন্ধিক তাঁর অন্তরের সত্যকে চেনেন বলে রাজভয় লোকভয় তাঁকে বিপথে নিয়ে যাবে না। প্রাবন্ধিক মনে করেন মানুষ যদি সত্যি করে তার আপন সত্যকে চিনে থাকে, তার অন্তরে মিথ্যার ভয় না থাকে, তাহলে বাইরের কোন ভয়ই তার কিছু করতে পারবে না। সত্য মানুষকে পথ দেখাবে আর মিথ্যা মানুষকে ধ্বংস করবে। নিজেকে চিনলে তার মনোবলই তাকে নতুনের পথে যুদ্ধ করার শক্তি জোগাবে। এখানে রাজ্যের ভয়, রাজ্যের ভেতরের বা বাইরের কোন শক্তিই তাকে বিপথে নিয়ে যাবে না।

৮। “যার ভিতরে ভয়, সে-ই ভয়, সে-ই ভয় পায়”- কথাটি দিয়ে লেখক কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর : “যার ভেতরে ভয়, সেই বাইরে ভয় পায়”- কথাটি দিয়ে লেখক বুঝিয়েছেন, যার হৃদয়ে ভয় আছে সে চারদিকে শুধু ভয়ই অনুভব করে। মানবহৃদয়ে সত্য না থাকলে মিথ্যা এসে বাসা বাঁধে। মানুষ যদি মনে সত্যকে ধারণ করতে না পারে তবে মিথ্যা তাকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়। মিথ্যা মানুষের জন্য সমস্যা সংকট ও ভয় ডেকে আনে। মানবহৃদয়ে এই দুর্বলতার কারণেই মানুষ বাইরের সবকিছুকে ভয় পায়। উক্ত বাক্য দ্বারা লেখক এটাই বুঝিয়েছেন।

৯। “আত্মাকে চিনলেই আত্মনির্ভরতা আসে।”- ব্যাখ্যা কর।
উত্তর : সত্য জানা ও আত্মাশক্তির বিকাশের মাধ্যমে আত্মনির্ভরতা আসে। অন্যের ওপর নির্ভর বেঁচে থাকাকে বলা হয় পরনির্ভরতা। যার নিচের শক্তির ওপর বিশ্বাস নেই, যে আত্মশক্তি ও সত্যকে জানে না সে-ই পরনির্ভর। লেখকের মতে, পরনির্ভরশীলতাকে বর্জন করতে হলে নিজের সত্যকে জানতে হবে, নিজের শক্তির ওপর আত্মা স্থাপন করতে হবে। আর তা হলেই মানুষ হয়ে উঠবে আত্মনির্ভরশীল। এভাবেই আত্মনির্ভরতা আসে।
১০। ‘এটা দম্ভ নয়, অহংকার নয়।’- কথাটি বুঝিয়ে দাও।

উত্তর : নিজেকে জানা, নিজের অন্তরের সত্যকে উপলদ্ধি করা, এটা দম্ভ নয়, অহংকার নয়- প্রশ্নোক্ত বাক্যে কবি এ ভাবটাই বোঝাতে চেয়েছেন। যে মানুষ নিজেকে চেনে তার মনের মধ্যে অপরিসীম জোর আসে। এই মনের জোরেই সে আর কাউকে ভয় করে না। আপন সত্যের শক্তিতে সে সব বাধা জয় করে। লেখকের মতে এভাবে নিজেকে চেনা এবং নিজের শক্তিতে আস্থা স্থাপন করা কোন দণ্ড নয়, অহংকার নয়- তা তার আত্মনির্ভরশীলতা।

১১। “যে নিজের ধর্মের সত্যকে চিনেছে, সে কখনো অন্য ধর্মকে ঘৃণা করতে পারে না।”- ব্যাখ্যা কর।
উত্তর : আলোচ্য উক্তিটির দ্বারা লেখক সাম্প্রদায়িকতার প্রতি তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। লেখক অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী। হিন্দু মুসলমানের মিলনের অন্তরায় কোথায় তা দেখিয়ে দেওয়া এবং সব জটিলতা দূর করাই তাঁর উদ্দেশ্য। মানুষে মানুষে যেখানে প্রাণের মিল, সত্যের মিল থাকে সেখানে কোন ধর্মের বৈষম্য বা হিংসার ভাব থাকতে পারে না। দেশের পক্ষে যা ভালো বা সত্য তা লক্ষ্য করেই লেখকের এ যাত্রা। তাঁর বিশ্বাস, যার নিজের ধর্মের ওপর বিশ্বাস আছে, যে নিজের সত্যকে চিনেছে, সে অন্যের ধর্মকে ঘৃণা করতে পারে না।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *